প্রগতির পথরেখা
অরুণ সোম
গড়িয়া, কলকাতা
১৯৩১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় প্রকাশন সমিতির উদ্যোগে বিদেশের বিভিন্ন ভাষায় সোভিয়েত সাহিত্যের এবং রুশ ভাষায় বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ — মূলত মানববিদ্যা সংক্রান্ত এবং সর্বোপরি ভাবাদর্শগত গ্রন্থাদি প্রচারের উদ্দেশ্যে মস্কোয় ‘বিদেশী শ্রমজীবীদের প্রকাশন সমিতি’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
১৯৩৯ সালে সংস্থাটি নাম বদল করে ‘বিদেশী ভাষায় সাহিত্য প্রকাশালয়’ এবং ১৯৬৩ সাল থেকে ‘প্রগতি প্রকাশন’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী সাহিত্য এবং আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক গ্রন্থাদির অনুবাদ ছাড়াও সোভিয়েত তথা রুশ সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রচারও ‘বিদেশী ভাষায় সাহিত্য প্রকাশালয়’ এবং ‘প্রগতি’র অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তাই সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রকাশিত অনুবাদের অন্তত এক-চতুর্থাংশ হত সোভিয়েত ও রুশ সাহিত্যের; আবার তার সিংহভাগ ছিল শিশু ও কিশোর সাহিত্যের, যেহেতু শিশু ও কিশোর মনে নির্দিষ্ট কোন ভাবাদর্শ গাঁথা হয়ে গেলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব সুদূরপ্রসারী হওয়া খুবই সম্ভব। প্রকাশের তৃতীয় স্থানে থাকত রুশ ও সোভিয়েত ধ্রুপদী সাহিত্যের অনুবাদ।
কিন্তু প্রচারের দিকটার কথা ছেড়ে দিলেও একথা অনস্বীকার্য যে রুশ সাহিত্য যে-কোন অবস্থাতেই হোক না কেন — সোভিয়েত-পূর্ববর্তী আমলেই হোক বা সোভিয়েত আমলেই হোক – মূলত ছিল মানবতাবাদী। তাই তার আবেদন ছিল সর্বব্যাপী। রুশ সাহিত্য বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্য রূপে স্বীকৃত। আর পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিশু ও কিশোর সাহিত্যের বিকাশ যে সোভিয়েত আমলেই হয়েছিল একথাও অস্বীকার করার উপায় নেই — অবশ্য সোভিয়েত পূর্ববর্তী আমলেও সাহিত্যের এই শাখাটিও যথেষ্ট উন্নত ছিল — এমন কি পুশ্কিন দস্তইয়েভ্স্কি তল্স্তোয় তুর্গ্যেনেভ্ থেকে শুরু করে এমন কোন রুশ লেখক ছিলেন না যিনি শিশু ও কিশোরদের জন্য কিছু-না-কিছু লেখেননি।
বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে — তখনও অনুবাদ সাহিত্যের এই প্রকাশালয়টি ‘বিদেশী ভাষায় সাহিত্য প্রকাশালয়’ নামে পরিচিত — সেই সময় সেখানে স্থায়ী বাংলা বিভাগ গড়ে উঠেছিল। সেই পর্বে অনুবাদক হিসেবে আমাদের দেশ থেকে সেখানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন : ননী ভৌমিক, নীরেন্দ্রনাথ রায়, কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (তাঁর স্ত্রী রেখা চট্টোপাধ্যায়ও কিছু অনুবাদ করেছিলেন), ফল্গু কর, সমর সেন ও শুভময় ঘোষ (শুভময় ঘোষের স্ত্রী সুপ্রিয়া ঘোষও কিছু অনুবাদ করেছিলেন)। সম্ভবত সেটা ১৯৫৭ সাল। এক কালের বিখ্যাত চলচ্চিত্র-অভিনেতা রাধামোহন ভট্টাচার্যও অল্প সময়ের জন্য সেখানে অনুবাদকের কাজ করেন। এরই কাছাকাছি কোন এক সময়ে কোলকাতা থেকে বিষ্ণু মুখোপাধ্যায়ও যোগ দেন। কোলকাতায় তিনি ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন। ননী ভৌমিক ও বিষ্ণু মুখোপাধ্যায় ছাড়া এই পর্বের অনুবাদকদের কারোই মস্কোয় অনুবাদকের কর্মজীবন তিন-চার বছরের বেশি স্থায়ী হয়নি। দীর্ঘ দুই দশকব্যাপী অনুবাদকের কর্মজীবনের অন্তে অবসর নিয়ে আশির দশকে বিষ্ণু মুখোপাধ্যায় দেশে ফিরে আসেন। একমাত্র ননী ভৌমিকই পাকাপাকি ভাবে মস্কোয় থেকে যান।
প্রথম পর্বের অনুবাদকদের মধ্যে একমাত্র নীরেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন রুশ ভাষা বিশেষজ্ঞ সাহিত্যিক। ননী ভৌমিক পরবর্তীকালে রুশ ভাষা শিখে সরাসরি রুশ থেকেই অনুবাদ করতেন।
সত্তরের দশক পর্যন্ত ননী ভৌমিক ও বিষ্ণু মুখোপাধ্যায় — এঁরা দুজন ছাড়া ‘প্রগতি’র বাংলা বিভাগে আর কোনও অনুবাদক ছিলেন না। ননী ভৌমিক বিবিধ বিষয়ের রচনার অনুবাদের সঙ্গে সঙ্গে রুশ গল্প উপন্যাস এবং বিশেষত শিশু ও কিশোর সাহিত্যের অনুবাদও করতেন। বিষ্ণু মুখোপাধ্যায় ছিলেন আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক গ্রন্থের অনুবাদক।
‘প্রগতি’ ততদিনে বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রকাশনালয়ে পরিণত হয়। পৃথিবীর ৫৬টি ভাষায় অনুবাদ সাহিত্য প্রকাশিত হত এখান থেকে। বছরে মুদ্রণসংখ্যা ১ কোটি ছাপিয়ে গিয়েছিল। ‘প্রগতি’র প্রকাশিত বইগুলি তাদের বিষয়বৈচিত্র্য, মুদ্রণ পারিপাট্য, নজরকাড়া অলংকরণ এবং সুলভ মূল্যের জন্য তৃতীয় দুনিয়ার দেশগুলিতে, বিশেষত ভারতের মতো দেশে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এক সময় সর্বস্তরের পাঠকমহলে সেগুলি ব্যাপক প্রচার লাভ করে। রুশ তথা সোভিয়েত সাহিত্য ও সংস্কৃতি দেখতে দেখতে দুনিয়ার ব্যাপক পাঠক সম্প্রদায়ের প্রাণের সম্পদ ও আকর্ষণের বস্তুতে পরিণত হয়।
সত্তরের দশকে বাংলাদেশ-এর আবির্ভাবের ফলে ‘প্রগতি’র বাংলা বিভাগের গুরুত্ব বহুমাত্রায় বৃদ্ধি পেল। বাংলা তখন আর উপমহাদেশের অন্তর্ভুক্ত পৃথক পৃথক দুটি দেশের প্রাদেশিক ভাষা মাত্র নয় — একটি দেশের প্রাদেশিক ভাষা এবং অন্য একটি দেশের রাষ্ট্রভাষা। তাই ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটল ‘প্রগতি’র বাংলা বিভাগের। এই পর্বে ‘প্রগতি’র বাংলাবিভাগে যোগদান করেন বাংলাদেশ থেকে হায়াৎ মামুদ, খালেদ চৌধুরি (পশ্চিমবঙ্গের চিত্রশিল্পী খালেদ চৌধুরী নন) ও দ্বিজেন শর্মা, কোলকাতা থেকে আমি এবং কবি মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, কিছুকাল পরে প্রফুল্ল রায় (ঔপন্যাসিক প্রফুল্ল রায় নন, তাঁর স্ত্রী কৃষ্ণা রায়ের একটি অনূদিত বইও রাদুগা থেকে প্রকাশিত হয়)। এছাড়া ননী ভৌমিক ও বিষ্ণু মুখোপাধ্যায় ত ছিলেনই। স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক দুজন বাঙালি যুবক — বিজয় পাল এবং সুবীর মজুমদারও এই সময় ‘প্রগতি’তে অনুবাদকের কাজে যোগ দিয়েছিলেন। এই পর্বের অনুবাদকদের মধ্যে ননী ভৌমিক ছাড়া শেষোক্ত দুজন এবং আমি ও হায়াৎ মামুদই সরাসরি রুশ থেকে অনুবাদ করতাম, বাকিরা ইংরেজি থেকে। ‘প্রগতি’র বাংলা বিভাগ তখন ভারতীয় ভাষাবিভাগগুলির মধ্যে সর্ববৃহৎ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মস্কোয় নিযুক্ত নিয়মিত অনুবাদকদের বাইরেও ‘প্রগতি’ ও ‘রাদুগা’ প্রকাশালয়ের জন্য বিভিন্ন সময়ে পুষ্পময়ী বসু (‘মা’), ইলা মিত্র (চাপায়েভ্), পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় ('মানুষের জন্ম'), গিরীন চক্রবর্তী (‘মানুষ কী করে বড়ো হল’, ‘তিমুর ও তার দলবল’, ‘ছত্রভঙ্গ’) সত্য গুপ্ত (‘পৃথিবীর পথে’), রথীন্দ্র সরকার (‘পৃথিবীর পাঠশালায়’), অমল দাশগুপ্ত (‘আমার ছেলেবেলা’), অরুণ দাশগুপ্ত (‘অ্যান্ড্রোমেডা নিহারীকা’), প্রদ্যোৎ গুহ, প্রফুল্ল রায়চৌধুরী ('বেঝিন মাঠ'), ক্ষিতীশ রায় (‘পুনরুজ্জীবন’), শঙ্কর রায় ('গমের শীষ', 'চুক আর গেক'), সেফালী নন্দী('বসন্ত'), ছবি বসু ('মনের মতো কাজ'), রবীন্দ্র মজুমদার ('ইস্পাত', 'অঙ্কের মজা'), শিউলি মজুমদার ('পিতা ও পুত্র') এবং অনিমেষকান্তি পালও ('কাশতানকা') অনুবাদ করেছেন। আবার প্রথম দিককার অনেক অনুবাদকের নাম অপ্রকাশিতই রয়ে গেছে। তাঁদের নাম এখন আর জানার উপায় নেই।
মস্কোর মির প্রকাশন থেকেও রুশ ও ইংরেজি ভাষা থেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যা সংক্রান্ত বেশ কিছু বই অনুদিত হয়। অনুবাদকদের মধ্যে, যতদূর মনে পড়ে, মস্কো থেকে অনুবাদ করেন ডাঃ শান্তিদাকান্ত রায় ('মানুষের অ্যানাটমি' ও 'ফিজিওলজি'), অভিজিৎ পোদ্দার, বদরুল হাসান ('কক্ষপথে নভোযান') এবং মাহবুবুল হক ('মৌমাছি ও মানুষ')। কলকাতা থেকে অনুবাদ করেছিলেন সিদ্ধার্থ ঘোষ, শৈলেন দত্ত ('পদার্থবিদ্যার মজার কথা'), ডাঃ সন্তোষ ভট্টাচার্য ('ধাত্রীর ধরিত্রী'), শান্তিশেখর সিংহ ('মহাসাগরের সজীব শব্দসন্ধানী', 'সকলের জন্য পদার্থবিদ্যা'), কানাইলাল মুখোপাধ্যায় ('রাসায়নিক মৌল, কেমন করে সেগুলি আবিষ্কৃত হয়েছিল') কান্তি চট্টোপাধ্যায় ('শরীরতত্ত্ব সবাই পড়ো')।
আশির দশকে ‘প্রগতি’র অগ্রগতি এতদূর হয়েছিল যে বিশেষভাবে গল্প উপন্যাস এবং শিশু ও কিশোর সাহিত্য অনুবাদের জন্য ১৯৮২ সালে ‘রাদুগা’ নামে পৃথক আরও একটি প্রকাশন সংস্থা গঠিত হয়। সেখানে আমিই ছিলাম বাংলা বিভাগের একমাত্র স্থায়ী অনুবাদক। ননী ভৌমিক ‘প্রগতি’তেই থেকে গেলেন, যদিও ‘প্রগতি’তে থেকেও ‘রাদুগা’র বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বইও তিনি অনুবাদ করেছেন। এছাড়া দ্বিজেন শর্মা এবং তাঁর স্ত্রী দেবী শর্মাও ‘রাদুগা’র দু-একটি ছোটখাটো বই অনুবাদ করেছেন। বছর দুয়েকের মধ্যে — ১৯৮৪ সালে তাশখন্দে ‘রাদুগা’র একটি বাংলা বিভাগও খোলা হয়। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পাঠরতা, এককালে আমার রুশ ভাষার ছাত্রী পূর্ণিমা মিত্র সেখানকার বাংলা বিভাগে অনুবাদকের কাজে যোগ দেন।
ইতিমধ্যে মস্কোয় ‘প্রগতি’র নতুন ভবন নির্মিত হয়েছে, ‘রাদুগা’ও পৃথক একটি ভবনে উঠে যাবার উপক্রম করছে। মস্কোয় অনুবাদচর্চার যখন রমরমা চলছে ঠিক তখনই ঘটে গেল সেই আকস্মিক অঘটন। আকস্মিক বলা ঠিক হবে না — ১৯৮৫ সালে দেশে ‘পেরেস্ত্রৈকা’ ঘোষিত হওয়ার ফলে এটাই প্রত্যাশিত ছিল। চূড়ান্ত বিপর্যয়ের জন্য আরও ছয় বছর প্রতীক্ষা করতে হল। ‘প্রগতি’র দীর্ঘ ছয় দশকের ইমারত তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ল। ১৯৯১ সালে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যে আমূল সংস্কার ঘোষিত হল তার ফলে রাষ্ট্রের তরফ থেকে সোভিয়েত ভাবাদর্শ এবং রুশ সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রচারের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেল। দ্বিতীয়ত, বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে ‘প্রগতি’ বা ‘রাদুগা’র মতো প্রকাশালয় একেবারেই লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল না — যে রাষ্ট্রীয় অনুদান ও সরকারি ভরতুকিতে এই প্রতিষ্ঠানগুলি চলত নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলনের ফলে একসময় তা বন্ধ হয়ে গেল। চাহিদা ও জোগানের নিয়ম অনুযায়ী চলতে গেলে বইয়ের যা মূল্য দাঁড়ায় যাদের মুখ চেয়ে তা ছাপানো তাদের পকেটে কুলোবে না। যে-কোন ভাবেই হোক, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় অনুদান বা সরকারি ভরতুকি দিয়ে এ সমস্ত বই প্রকাশ করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।
তাই ১৯৯১ সালের ২৫ মার্চ তারিখের এক সরকারি হুকুমনামা বলে ঘোষণা করা হল : ‘বিদেশি ভাষায় সাহিত্যের প্রকাশ লাভজনক না হওয়ার কারণে ‘প্রগতি’র পরিচালকমণ্ডলীর সিদ্ধান্ত আনুসারে আগামী এপ্রিল মাস থেকে একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে যে সমস্ত বইয়ের ব্যাপক চাহিদা আছে শুধু সেগুলিই প্রকাশিত হবে। বস্তুতপক্ষে, প্রকাশালয়ের বিদেশি ভাষার সবগুলি দপ্তরই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’ দেশের অভ্যন্তরে আমজনতার রুচি ও চাহিদার নিয়ম মেনে ‘প্রগতি’ ও ‘রাদুগা’ থেকে দেশের অগণিত পাঠকদের জন্য বিদেশি ভাষা থেকে সস্তার রগরগে নভেল ডিটেকটিভ ইত্যাদি রুশ অনুবাদে প্রকাশিত হতে লাগল। সেই বছরই ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশালয়ের দালান কোঠা এবং অন্যান্য স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বিভিন্ন ব্যক্তিগত মালিকানাধীনে চলে যাবার ফলে ‘প্রগতি’ ও ‘রাদুগা’ গাড়ির শো রুম, নানা ধরনের দোকানপাট আর লাভজনক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের অফিসের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল।
আজ দু’দশকের বেশি সময় হতে চলল ‘প্রগতি’ বা ‘রাদুগা’ অতীতের বস্তু। আমাদের দেশের বর্তমান প্রজন্ম ‘প্রগতি’ বা ‘রাদুগা’ থেকে প্রকাশিত সেই সমস্ত অনুবাদের সঙ্গে একেবারেই পরিচিত নয় — অনেকে তাদের নাম পর্যন্ত শোনেনি।
‘প্রগতি’ ও ‘রাদুগা’র অর্ধশতাব্দীকালের যে সৃষ্টি দুই দশকের মধ্যে অবলুপ্ত হতে চলেছিল, সম্প্রতি তার উদ্ধারসাধন করে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সংরক্ষণ ও প্রচারের যে বিপুল শ্রমসাধ্য কাজে স্নেহভাজন প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সোমনাথ দাশগুপ্ত ব্রতী হয়েছে এর জন্য তারা যেমন আমাদের প্রজন্মের তেমনি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানুষদেরও কৃতজ্ঞতাভাজন হয়ে থাকবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো সমাজ ও সাহিত্য নিয়ে এমন ব্যাপক ও দীর্ঘকালীন পরীক্ষানিরীক্ষা এবং তার এমন আকস্মিক অবসান পৃথিবীতে আর কখনও ঘটেনি; তাই সোভিয়েত সমাজব্যবস্থার মতো সোভিয়েত সাহিত্যও সমগ্র বিশ্বের কৌতূহলী গবেষকদের দীর্ঘকাল আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে। সেদিক থেকে এদের উদ্যোগ ভবিষ্যৎ গবেষণারও আকর হয়ে থাকবে।
সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজে বিভিন্ন মহল থেকে যে ব্যাপক সাড়া ও সহযোগিতা মিলছে তা অত্যন্ত উৎসাহব্যাঞ্জক। তাই মনে হয় এখনও সব ফুরিয়ে যায়নি। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ত ঘটেই। আশা করা যেতে পারে এদের উদ্যোগের ফলে মানবতাবাদী রুশ সাহিত্যজগৎ আবারও আজকের দিশেহারা মানুষের পথের দিশারি হবে।
— অরুণ সোম, ৩০.০১.২০১৪
(হ্যাঁ, অরুণ সোম মানে সুবিখ্যাত অনুবাদক অরুণ সোমই। আনাড়ি সিরিজ, প্রশান্ত দন, রিখার্ড জোর্গে, দুই ইয়ারের যত কাণ্ড, পাহাড় ও স্তেপের আখ্যান ইত্যাদি অজস্র বইয়ের বাংলা অনুবাদ মূল রুশ ভাষা থেকে খোদ মস্কোয় বসে করেছিলেন তিনিই। এই পঁচাত্তর বছর বয়সেও অক্লান্ত সৃষ্টিশীল মানুষটির আশীর্বাদ, আতিথেয়তা ও সহায়তা পাওয়া আমাদের এই “ছোটোবেলা ফিরে আসুক“ প্রকল্প থেকে সেরা প্রাপ্তি। শুধু অনুবাদক হিসেবেই ওঁর কৃতিত্বের সমীচীন মূল্যায়ন এখনও হয়নি। একেবারে ছোটোদের বই থেকে শুরু করে নোবেলজয়ী উপন্যাস, রাজনৈতিক পাঠ্য থেকে শুরু করে ভাবালু কবিতা — এই মানুষটি এত সাবলীল অনুবাদে বাঙালীর পাঠযোগ্য করে তুলেছেন বিগত প্রায় চার যুগ ধরে, যে বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের ইতিহাসে ওঁর জন্য একটা সম্পূর্ণ অধ্যায় বরাদ্দ থাকা উচিত। আমাদের অধিকাংশের ছোটোবেলা আর তাদের পাঠাভ্যাসের রূপকথা-অনুষঙ্গ শ্রী অরুণ সোমের কাছে প্রজন্মান্তরে ঋণী রইল।
তাঁর পঁচাত্তর বছর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ২৩শে সেপ্টেম্বর'২০১৩-য় আনন্দবাজার পত্রিকা সংবাদপত্রের 'কলকাতার কড়চা' বিভাগে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি এখানে ক্লিক করলে পড়া যাবে।)
পূর্ণিমা মিত্র
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ. পড়াকালীন আমি যোগ দিই ইন্দো-সোভিয়েত কালচারাল সোসাইটি (ইসকাস)-র সন্ধ্যাবেলার ক্লাসে রুশভাষা শিখতে। সেখানে আমার দ্বিতীয় সেমিস্টারে অরুণ সোম ছিলেন আমাদের শিক্ষক। সেই সময় আমি ও আমাদের সহপাঠীরা বিস্ময়মেশানো শ্রদ্ধা নিয়ে পড়তাম ননী ভৌমিক ও অন্যান্য অভিজ্ঞ অনুবাদকদের অনুবাদ করা বইগুলি।
পরে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পাড়াকালীন আমার সৌভাগ্য হয়েছিল কয়েকজন রুশ বাংলাভাষা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরিচিত হবার। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিট্যুট অফ এশিয়ান এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ বিভাগে বাংলাভাষার অধ্যাপিকা ইরিনা প্রকোফিয়েভা আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁর ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে পরিচয় করাতে। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম দেখে যে জন দশ-বারো ছেলেমেয়ে অসীম আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে। আমি তাদের ক্লাস নিয়েছি সপ্তাহে একদিন করে তাদের কথ্যভাষা শেখাতে ও পরিচর্চা করতে। ইনস্টিট্যুটের অডিওরুমে আমার পড়া টেক্সটগুলো রেকর্ড করে রাখা আছে ভবিষ্যত ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহারের জন্য।
আর একজন সুবিখ্যাত বাংলাভাষা বিশারদ অধ্যাপক আলেক্সান্দর গ্নাত্যুক দানিলচুক আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন মস্কো ইনস্টিট্যুট অফ ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস-এর বাংলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে, সেখানেও আমি কথ্যভাষার ক্লাস নিয়েছি। সেখানের ছাত্রছাত্রীদের বাংলা ভাষা শেখার উৎসাহ উদ্দীপনার কোনো ঘাটতি ছিলনা।
এছাড়াও আমি অংশগ্রহন করেছি বাংলা-রুশ ও রুশ বাংলা আলাপ সহায়িকা প্রকাশনায়, প্রকাশন-পূর্বকালীন সমালোচক হিসেবে।
আমি যোগ দিলাম রাদুগা প্রকাশনে ১৯৮৫-তে তাশখন্দ বিভাগে। সেখানে আমার অনুবাদগুলির সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন রুসলান তাহাউদ্দিনভ ও আনাতোলি কাবুলেই। তাদের অসাধারণ উদ্যোগ ও উদ্দীপনা তাশখন্দে বাংলা বিভাগ শুরু হবার কারণে আমাকে অভিভূত করেছিল। এর আগে তাশখন্দে ছিল কেবলমাত্র উর্দু ও হিন্দি। দুর্ভাগ্যবশত আমার অনুবাদকজীবন দীর্ঘজীবি হয় নি। আমি তাশখন্দে ছিলাম তিন বছর। অনুবাদ করেছি সবসমেত বারোটি বই, যার মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় "বাবর" ও "চিরদিন মনে রেখো"
আমি তাশখন্দে আসার বছর তিনেক পরে রাদুগা তাশখন্দ বিভাগ বন্ধ করে দেয়, আমি ফিরে যাই মস্কো। ইতিমধ্যে মস্কোতে শুরু হয়ে যায় দারুণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ডামাডোল যার ফলে রাদুগা প্রকাশনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল চিরকালের মতো।
পরিবেশবান্ধব ইবুক
সুমন্ত মল্লিক
বারাসত, উত্তর চব্বিশ পরগণা
সত্যি, আজ খুব ভালো লাগছে। বলার মত ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আর, পিডিএফ ফরম্যাট এর বই ১০০% পরিবেশবান্ধব। ইবুক হল এমন এক প্রযুক্তি যার জন্যে ভবিষ্যতে বৃক্ষচ্ছেদন সম্পূর্ণভাবে রোধ করা সম্ভব হবে এবং অনেক প্রাচীন, মূল্যবান বই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আর নষ্ট হবেনা ।
একদিন সোমনাথদা'র (সোমনাথ দাশগুপ্ত) কাছে শুনলাম যে সেই পুরনো বইগুলো যেন এখনকার ছোট ছেলেমেয়েরাও সবাই পড়তে পারে তার উপযুক্ত ব্যবস্থা করছেন। তাঁরা এবং তাঁদের একটি টিম দুর্লভ এবং পুরনো পোকায় সমস্ত রুশ বই কাটা বই সংগ্রহ করছেন এবং সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা করেছেন পিডিএফ ফরম্যাটে বইগুলি সকলের জন্যে পড়ার উপযোগী করে তোলার জন্যে। শুধু তাই নয়, এর যথাযথ গুণমানের জন্যে যে-কেউ খুব সহজেই প্রিন্ট করে নিতে পারবেন।
বর্তমান যুগের ছোট ছেলেমেয়েরা আর কয়েকদিন আগেও এই সব বই পড়তে পারতনা কারণ এই সমস্ত বইগুলি ক্রমশই যুগের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছিল। জানতে পারলাম যে সকলের বাড়ি-বাড়ি পৌঁছে গিয়েছে এই টিম এর প্রয়াস। আজও অনেক বইপ্রেমীর কাছে রাশিয়ান বইগুলি রয়েছে এবং তাঁরাও এই বই গুলির রিস্টোরেশন এর প্রক্রিয়ার সঙ্গে একমত। আমাদের বাড়িতে এবং 'শ্রীকৃষ্ণ সঙ্ঘ লাইব্রেরি' তে অনেক রাশিয়ান বই ছিল। সোমনাথদা'র সাথে পরিচয় হওয়ার পর সব জানতে পেরে আমি সোমনাথদাকে বইগুলি দিই। বলাই বাহুল্য সোমনাথদাও তাঁর ছোটবেলার এই লাইব্রেরিতে বইগুলোর খুদে পাঠক ছিলেন। এখন ভেবে খুব ভালো লাগছে যে অনেক বই হয়ত ছিল যেগুলি খুব কম ছাপা হয়েছিল, কিংবা খুব কম লোকের হাতে গিয়ে পৌঁছেছিল, বই গুলির সেই যাত্রা এই টিমটির হাত ধরে আজ পৌঁছতে পারবে সকলের ঘরে ঘরে। অনেক ভালবাসা, শুভেচ্ছা আর এগিয়ে চলার শুভকামনা রইল।
(সুমন্ত ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে বটে, হাত কিন্তু ফোটোশপে পাকা। ব্লগের পৃথিবীর ইতিহাস বইটিতে ওঁর হাতের কাজ দেখা যাবে। বেশ কিছু ছাপা বইপত্রের কভারেও পাওয়া যাবে, যেহেতু কাজটা সে প্রফেশনালিই করছে। ছোটোবেলা থেকেই সর্বগ্রাসী পাঠক। বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই যে শ্রীকৃষ্ণ লাইব্রেরি, তার বইয়ের আলমারিগুলোর ধুলো ঢাকা পাল্লায় এখনো সুমন্তের ছোটোবেলার হাতের লেখায় বইয়ের তালিকা গঁদের আঠায় আটকানো।)

বাইরে অন্ধকার, বরফ পড়ছে, জানালার শার্সি ঢেকে দিচ্ছে তুষার কণা | গনগনে চুল্লির তাতে ঘরের ভেতরটা আরামের মতো গরম, গালচের ওপর কুন্ডুলী পাকিয়ে ঘুমোচ্ছে ‘ভাসকা’ বেড়াল, পাশে ঝাঁকড়ালোমো গেঁয়ো কুকুর ‘পস্তোইকো’ | সামোভারে জল ফুটছে, সুরুয়ার মন মাতানো খুশবু ঘর জুড়ে…
উজ্জল নীল আকাশের নীচে পাইনের ঘন বন, পাতার ফাঁক দিয়ে ত্যারচা করে এসে পড়ছে সোনালী রোদ্দুর, জলাজমি থেকে ভেসে আসছে বনমোরগ, বুনো পাতিহাঁস আর লম্বা ঠোঁটওয়ালা স্নাইপ পাখির ডাক | ক্ষুদে ফারগাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে উঁকি মারছে ছেয়ে ছেয়ে খরগোশ | ঝোপে ঝোপে নানা জাতের বেরি ফলে আছে – ক্র্যানবেরি, বিলবেরি, বুনো স্ট্রবেরি আর সোনালী ক্লাউডবেরি | লাল লাল ফুলো গাল খুকুরা টুকরি হাতে বনে চলেছে ব্যাঙের ছাতা কুড়োতে | সঙ্গে আছে কুড়ুল কাঁধে খোকারা – জলার আতঙ্ক, ভয়ংকর নেকড়ে ‘বুড়ো জমিদার’ কে দেখেই নেবে আজ |
মস্ত শহরের ব্যস্ত চক | আশপাশ দিয়ে তড়িঘড়ি ছুটছে মোটরগাড়ি, ঢাউস বাস, লম্বা ট্রলি বাস | মাঝখানে দাঁড়িয়ে নির্ভীক ট্রাফিক পুলিশ | একটু দুরে বড় বড় গাছে ঢাকা চওড়া বূলেভারের দু ধারে সারি সারি বাড়ি, সামনে খেলা করে ছেলেমেয়েরা, গল্প জমায় বুড়োর দল, জটলা করে গিন্নিরা – পড়শি সব | শহরের মিনারের মাথায় দিনরাত জ্বলজ্বল করে লাল তারা |

তৈরী হলো Soviet Books Translated in Bengali ব্লগ | নির্ভেজাল ভালবাসা দিয়ে গড়া – বইয়ের প্রতি ভালবাসা, বই-প্রেমী মানুষদের প্রতি ভালবাসা | এই ব্লগ থেকে যে কেউ বিনামূল্যে যে কোনো বই ডাউনলোড করতে পারবে, প্রিন্ট করলে সেটি হবে এক্কেবারে আসল বইটির মতো সদাসতেজ | শর্ত একটাই – বই ডাউনলোড করার পর, পারলে একটু কিছু লিখে যাবেন; এত যত্ন নিয়ে যারা কাজটি করছেন, তাদের একটু মন ভালো করে দেবেন | মুখে মুখে, থুড়ি, বইয়ের পাতায় পাতায় খবর ছড়াচ্ছে, আরও বন্ধুরা এগিয়ে আসছেন, দুহাত তুলে সাধুবাদ জানাচ্ছেন এই প্রচেষ্টাকে | নতুন প্রজন্ম (সেই সঙ্গে আমরাও) নতুন করে চিনছে দুই দশকেরও আগে হারিয়ে যাওয়া সেই বইয়ের জগতকে |
সংহিতা
ছবি ও প্রামাণ্য তথ্য – Soviet Books Translated in Bengali ব্লগ
ফেসবুক কমিউনিটি পেজ – http://www.facebook.com/sovietbooksinbengali/
ফেসবুক গ্রুপ – http://www.facebook.com/groups/sovietbooksinbengali/
গোগ্রাসে বুরাতিনো
রাজর্যি সেনগুপ্ত
বারাসত, উত্তর চব্বিশ পরগণা
কম্প্যুটার ছিল না, মোবাইল ছিল না, কেবল টিভিতে সাড়ে চারশ চ্যানেলের বেমক্কা লাফালাফি ছিল না, সব থেকে অদ্ভুত, প্লাস্টিকের থলিও ছিল না আর কুড়ি মাইক্রন না চল্লিশ মাইক্রন সেই মাথাব্যাথাও না। আমরা হাঁ করে, চোখ দুটো গোলগোল করে, চুল খাড়া করে, গোগ্রাসে বুরাতিনোর গপ্প পড়তুম, অজানা দেশের না জানা কি নাহুম গোঁসাই গপ্প পড়তাম, পেনসিল আর সর্বকর্মার আডভেঞ্চার পড়তাম, ছোট্ট গোল রুটির গপ্প পড়তাম, ধোলাইরামের ছড়া পড়তাম, আরেকটু বড় হয়ে সার্কাসের ছেলে বা উভচর মানুষ পড়তাম। বাঁটুল বা হাঁদা ভোঁদা বা কাকাবাবুর মতো, ওরাও তো ছিল। বাকিদের তো তাও দেখি। ওরা যে কতগুলি বড় বড় দেশের বড় বড় মানুষের বড় বড় বুদ্ধির জোরে একেবারে নেই হয়ে, ভোঁ হয়ে, ধোঁয়া হয়ে যাবে, তা কি কখনো ভেবেছিলাম।
সত্যি কথা বলতে কি, ছেলেবেলা কি আর কখনো ফিরে আসে? তবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছে। মাঝে মাঝেই এক একটা বইয়ের ছবি দেখি, দু লাইন পড়ি, আর মনের কোন চিলেকোঠা থেকে হুড়মুড় করে কালবৈশাখীর মতো স্মৃতিগুলি ছুটে ছুটে আসে। যাকে বোধহয় চিরদিনের জন্য ভুলে ছিলাম, সে যেন হঠাৎ সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে বলে ‘এই তো আমি’। তারপরে পাগলের মতো অক্ষম স্মৃতি কণ্ডূয়ন,- ‘তাই তো। কবে কোথায় যেন দেখা হয়েছিল’, বা ‘কে যেন বইটা মেরে দিল’। আর তার লেজ ধরে ধরে “বহুযুগের ওপার হতে” কত কথাই যে ফিরে ফিরে আসে।
নাই বা হল নতুন বইয়ের কাগজের গন্ধে মোড়ানো নিঃশ্বাস নেওয়া, নাই বা হল ছবির কিনারে আঙ্গুল বোলানো। নাই বা হল প্রথম পাতায় যত্নে লাইন টেনে নাম লেখা, নাই বা হল বইয়ের আলমারিতে ন্যাপথালিনের গুলি ছড়ানো। এই যেটুকু পাওয়া, তাই বা কম কী? ধন্যবাদ আপনাদের সবাইকে, ধন্যবাদ যাঁরা বই ধার দিয়েছেন, যাঁরা সেগুলি যত্ন করে ডিজিটাইজ করে স্ক্যান করে আপলোড করেছেন, যাঁরা ডাউনলোড করছেন সব্বাইকে। আপনাদের সব্বার ছেলেবেলা ফিরে ফিরে আসুক এই ব্লগের হাত ধরে।
হারিয়ে যাওয়া ছোটোবেলা
দময়ন্তী দাশগুপ্ত
লেকটাউন, কলকাতা
ছোটবেলায় রাশিয়ান বই পড়ার আগ্রহে একটু বড় হতেই সঙ্গী হয়েছিলেন চেকভ, দস্তাভয়েস্কি, গোর্কী, তুর্গেনেভরা। বারবার পড়েছি ‘পাহাড় ও স্তেপের আখ্যান’ বা ‘মা’। বইমেলা এলেই ভস্তক আর মণীষার স্টলে হানা দিয়েছি আরও আরও বইয়ের খোঁজে।
তারপরেও কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। বিয়েও করলাম আমরা একবছর বইমেলার শেষদিনে। মেয়ের প্রায় জন্ম থেকেই নতুন করে কিনতে শুরু করলাম ছোটদের রাশিয়ান বইগুলো। ততদিনে ওগুলো প্রায় দুষ্প্রাপ্য হয়ে এসেছে। বেশ কিছু নতুন বইও পেলাম হঠাৎ করে একবার।
মেয়েও এখন অনেকটা বড় হয়ে গেছে। অনেকগুলো বছর, বদলে যাওয়া ঠিকানা। নানা কারণে সব মিলিয়ে অনেক বই আর খুব ভালো অবস্থাতেও নেই এখন। মাঝে মাঝেই মনে হত আমার মেয়ের পরবর্তী প্রজন্ম ওদের কাছে সেদিন কতটুকু পৌঁছাবে? এই বইগুলোর কয়েকটার প্রায় একইরকম করে ভারতীয় সংস্করণ হয়েছে। কিন্তু ‘শিশুকাহিনী’ বইটা হাতে নিয়ে পাতা উলটে মনে হল কী যেন নেই। বুঝলাম সেটা আমার হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলা, যেটা রয়ে গেছে ওই রাদুগা বা প্রগতি প্রকাশনার বইগুলোর পাতায়।
তোমাদের সাইটটির কথা জেনে প্রথম থেকেই বেশ ভালো লেগেছিল। ছেলেবেলা মাখানো বাংলা সোভিয়েত বইগুলো দেখে আরও ভালো লাগল। হয়তো বইয়ের পাতা হাতে ছুঁয়ে দেখার মজাটা থাকবে না, থাকবে না নতুন কিম্বা পুরোনো বইয়ের গন্ধ। কিন্তু আগামী দিনের ছেলেমেয়েরা তো এসবেই বেশী অভ্যস্ত হবে। আলমারিতে থাকা পুরোনো বইয়ের বদলে আগ্রহী হবে ডিজিটাল লাইব্রেরিতে। একসঙ্গেই পেয়ে যাবে অনেক অনেক বই। আমাদের ক্ষেত্রে সাইটটি নস্টালজিয়ার সৃষ্টি করলেও সত্যিকারের কাজে লাগবে কিন্তু ওদেরই।
ভালো কাজ করলে বাধা আসে, আর তখনই বোঝাও যায় যে কাজটা সত্যিকারের ভালো হচ্ছে। কিছু মানুষ বিরোধীতা করলেও অনেক মানুষকেই পাশে পাবে। সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়েও আমাদের মত অনেকেই বই দিয়েছে, উৎসাহ দিয়েছে। চেষ্টা করো ব্লগ থেকে একটা পুরোদস্তুর ওয়েবসাইট করে ফেলার। একবার পিছু ফিরে তাকিয়ে আমার অনুভুতির কথা লিখে পাঠালাম। কারণ আশা রাখি আগামীদিনের শিশুদের জন্য তোমাদের এই প্রচেষ্টা সফল হবে।
(এই ব্লগের অন্যতম সাহায্যকারী দময়ন্তী দাশগুপ্তের জন্ম ও যাপন সাহিত্যের পরিবেশেই। তাঁর পিতা হিতেন ঘোষ ও মাতা আলপনা ঘোষ বিশিষ্ট সাহিত্যিক এবং স্বামী রত্নদীপ দাশগুপ্ত অন্যধারার সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক। দময়ন্তী নিজের খুব ছোটো বয়স থেকেই উচ্চমানের নানা লিটল ম্যাগাজিনে সাহিত্য চর্চা করে এসেছেন, বর্তমানে তাঁর স্বামীর সঙ্গে 'আমাদের ছুটি' নামক একটি ভ্রমণ বিষয়ক ওয়েব-পত্রিকা পরিচালনা করছেন এবং বর্তমানে ভ্রমণ কাহিনি সম্পর্কিত গবেষণার সঙ্গে জড়িত আছেন। )
ঈশ্বরের আর্শীবাদ
অনমিত্র রায়
হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ
এভাবে প্রত্যেক বছর বইমেলা থেকে এইসব রাশিয়ান বই কিনতে কিনতে একদিন দেখি অনেকটা বড়ো হয়ে গেছি, তবু রাশিয়ান বইয়ের নেশা কাটেনি, বরং আরও গাঢ় হয়েছে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন কাকে বলে সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। আর একটা গোটা দেশও যে ভেঙে টুকরো টুকরো হতে পারে তা-ও ধারণা ছিল না। তাই আচমকা সেইসব কম দামি, ঝকঝকে ছাপার মনমাতানো বই আসা বন্ধ হয়ে যেতে মন যারপরনাই খারাপ হয়ে গেল। খালি মনে হতে লাগল, কেউ কি আর কোনোদিন এই বইগুলো ছাপবে না? কেউ না?
ঈশ্বরের আশীর্বাদের মতোই একদিন সকালে ফেসবুক খুলেই জানতে পারলাম আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশব নিয়ে কিছু মানুষ কাজ করছেন। কেউ কি আর দেরি করে? সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করি তাঁদের সঙ্গে; বলি কোনো সাহায্য করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করব। তাঁরাও সাড়া দেন, আমার সংগ্রহ থেকে বই দিই তাঁদের। চায়ে চুমুক দিতে দিতে তাঁদের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে এই বিপুল কর্মকাণ্ডের কথা কথা জেনে অবাক হয়ে যাই। তার পর থেকে নিয়মিত চোখ রাখি ওয়েবসাইটে। স্ক্যান করা প্রতিটি পাতার গুণগত মান দেখে মন আপ্লুত হতে থাকে। হারানো সম্পদ একে একে ফেরত পাওয়ার আনন্দে মশগুল হয়ে যাই। লোভ বেড়ে যায়। আর তাই এই অনুরোধ করতে দ্বিধা করি না, বইগুলো, আবার ছাপার উদ্যোগ নিন না? নেবেন, প্লিজ?
(অনমিত্র রায় একজন পুস্তকপ্রেমী ও একনিষ্ঠ পাঠক। এই ব্লগের জন্য তাঁর সংগ্রহের মূল্যবান কয়েকটি বই ধার দিয়ে তিনি সাহায্য করেছেন।)
পুঁজি ছিল দুচোখ ভর্তি স্বপ্ন
সোমনাথ ও শুচিস্মিতা দাশগুপ্ত
বারাসাত, উত্তর চব্বিশ পরগণা, পশ্চিমবঙ্গ
তখন পুঁজি বলতে ছিল - দুচোখ ভর্তি স্বপ্ন, ছোটোবেলার সেই হারিয়ে যাওয়া জগৎটার পুনঃসন্ধান পাওয়ার ইচ্ছে আর ব্যক্তিগত সংগ্রহের বই কয়টি। তারপর ধীরে ধীরে নিজেদের পাড়া, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খোঁজ। সেখান থেকে খানিকটা পাওয়া, আর, আরো বেশি না পাওয়ার সন্ধান আমাদের নিয়ে যায় বেপাড়ায় আর অগুনতি "অনাত্মীয়"দের ঠিকানায়। যারা পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে আমাদের আত্মার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছেন। তাঁদের কাছে আমরা চিরঋণী থাকলাম।
আজ গর্বের সাথে আমরা বলতে পারি যে, সেই প্রথম পদক্ষেপের গুটিকয়েক বই আজ একটা ব্লগের রূপ নিতে পেরেছে।
বাংলায় অনূদিত সোভিয়েত বইয়ের ভাষাগত গুণগত মূল্য, মূলসৃষ্টির তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। আমাদের গর্বের বিষয়, সেই মায়াবী দুনিয়ার রূপকারদের অন্যতম শ্রী অরুণ সোমকে আমরা আমাদের পাশে পেয়েছি । এই পথে চলতে চলতে সঙ্গী ও উৎসাহদাতা হিসেবে, সাহায্যকারী হিসেবে পাশে পেয়েছি নবারুণ ভট্টাচার্য, অজয় গুপ্ত, বিমল দেব, যশোধরা রায়চৌধুরী, কিন্নর রায়, প্রমুখ খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বদের এবং আরো বহু বহু মানুষকে যাঁরা হয়তো সেই অর্থে "বিখ্যাত" নন, কিন্তু তাঁরা এই প্রজেক্টের পথ চলার অন্যতম সহায়, তাঁরা তাঁদের মূল্যবান স্মৃতি, তথ্য, সন্ধান, বইয়ের সংগ্রহ এমনকি কিছু ক্ষেত্রে অর্থ সাহায্য করেও পাশে দাঁড়িয়েছেন, আমাদের উপর ভরসা করে নিজেদের খানিকটা ছোটোবেলা আমাদের দিয়েছেন স্ক্যান করার জন্য।
আমরা প্রফেশনাল নই। এমনকি ইমেজ প্রসেসিং বা গ্রাফিকসের প্রথাগত শিক্ষা বা ট্রেনিং ও আমাদের নেই। আমাদের কাজটা সম্পূর্ণ ভাবে আমাদের ভালোবাসার জায়গা থেকে তৈরি। সেইসব চিরনতুন বইগুলোর প্রতি আমাদের ভালোবাসা, যে বইগুলো একদিন আমাদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল, আমাদের স্বপ্নের সাথী ছিল, আমাদের ছোটোবেলার অংশ ছিল, জড়িয়েছিল আমাদের ছোটো থেকে বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি পরতে। সেইজন্যেই এই প্রজেক্ট থেকে কোনোরকম আর্থিক লাভ আমরা আশা করি না। আমাদের ব্লগ থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষ বই ডাউনলোড করতে পারবেন। স্ক্যান করার পর সফট কপি বইয়ের সাইজ বেশ বড় হয় যা সহজে ডাউনলোড করা সম্ভব নয়। তাছাড়া ছোটোবেলার দাগাদাগি, আঁকা, রঙের দাগ, বইয়ের বয়সের জন্য হওয়া হলুদ ভাব, পাতা ছিঁড়ে যাওয়া, জলের, খাবারের দাগ সব মিলিয়ে এই সব বইগুলোর অবস্থা সাধারনভাবেই বেশ শোচনীয়। কিন্তু আমরা তো ফিরিয়ে নিয়ে আসছি আমাদের ঝকঝকে ছোটোবেলা, আমাদের পরের প্রজন্মের জন্য এক্কেবারে নতুনের মতো অবস্থায় এই বইগুলো ফিরিয়ে দিতে চেয়ে তাই আমাদের ঐ স্ক্যানের পর বই প্রসেস করা ছাড়া অন্য উপায় নেই। বইটি ঠিক যেমন ভাবে ছাপা হয়েছিল, ছোট্টোবেলায় কেনার সময় প্রথমবার হাতে নেওয়ার সময় বইটিকে যেমন ভাবে দেখেছিলাম, ঠিক, অবিকল সেইভাবে বইটা ফিরিয়ে দিতে চেয়ে সার্চেবিলিটি বা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের আধুনিকতম প্রযুক্তির মানে পৌঁছনোর চেষ্টায় আমরা বিরত থেকেছি। শুধু লক্ষ্য রেখেছি সমস্ত ইলেকট্রনিক গ্যাজেটে যাতে বইগুলো দেখা যায়, পড়া যায়। সবাই যাতে ফিরে পাওয়া ছোটোবেলাটুকুর স্বাদ নিতে পারেন।
শিশুদের কল্পনার জগৎ অসীম। তারা কোনো দেশ জাতি ধর্ম সময় ভাষার গন্ডীতে আবদ্ধ নয়। তাদের কাছে রূপকথার জগৎ, তার অনন্যতাই আসল। লুপ্তপ্রায় সোভিয়েত বইগুলোর সেই যাদুর ছোঁয়া পরবর্তী প্রজন্মের হাতে দিয়ে যেতে পারছি, পারবও আর অদূর ভবিষ্যতে সমস্ত বাংলা বই, যা সোভিয়েত রাশিয়ায় প্রকাশিত হয়েছিল, সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল আর্কাইভ করে ফেলতে পারব বলেই আমরা বিশ্বাস করি।
(পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও একটি বহুজাতিক সংস্থার প্রিন্সিপাল প্রসেস ইঞ্জিনিয়ার সোমনাথ দাশগুপ্ত বাংলায় অনূদিত সোভিয়েত বইয়ের ডিজিটালকরণের মূল উদ্যোক্তা। এই ব্লগ ও প্রকল্পের নেতৃত্বও তিনিই দেন। প্রধানত ছোটোদের জন্য বাংলায় অনূদিত সোভিয়েত বইগুলি সবাইকে ফিরিয়ে দিতে চান তিনি। শুচিস্মিতার আগ্রহেই এই প্রয়াসের শুরু। এই ব্লগের ফেসবুক পাতাটি শুচিস্মিতা সম্পাদনা করেন।)
বাবার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে
ফরিদ আক্তার পরাগ
রাজশাহী, বাংলাদেশ
এবার আসা যাক রুশ বই সংগ্রহের বিষয়টিতে। ছোটবেলায় আমার বাবা আমাদের অনেক রুশ বই কিনে দিতেন। বইগুলো আমাদের ভীষণ ভাল লাগতো। যখন বড় হলাম তখন মনে হলো রুশ সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞানের বইগুলো সংগ্রহ করা দরকার ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য। শুরু হলো বই সংগ্রহ। বিভিন্ন লাইব্রেরী, পুরনো বই-এর দোকান এবং ফুটপাথ খুঁজে বইগুলো সংগ্রহ করেছি। খুঁজতে গিয়ে কিছু বই দুই বার করে সংগ্রহ করা হয়ে গেছে। কিছু বই না পেয়ে মনটাও খারাপ হয়েছিল আমার।
আপনাদের এই সাইটের খোঁজ পেয়ে সে দুঃখ কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে। আপনাদের সাইটের সাথে যুক্ত হতে পেরে খুব ভাল লাগছে। আমার ছেলে-মেয়েও খুব খুশি।
আপনাদের উদ্দেশ্য যদি সৎ হয় তবে আমি আপনাদের সাথে আছি।
আপনাদের সকলের জন্য রইল আমার আন্তরিক শুভ কামনা।
ফরিদ dar library dekhe puro pagol :)
ReplyDeleteপরাগ ভাই, আমার দেখা একজন অতি সাদামাটা নিপাট ভালো মানুষ। বই সংগ্রহ ছাড়াও তাঁর আরো কিছু গুন আছে যা সবার জানা দরকার। তিনি সেই মানুষ যার উদ্যোগে রাজশাহীর একমাত্র রেজিষ্টার ফটোগ্রাফিক সোসাইটি গড়ে উঠেছে, এখন পর্যন্ত এটি রাজশাহীর একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখান থেকে ফটোগ্রাফিতে “ব্যাসিক কোর্স” করানো হয়। পেশায় তিনি একটি জাতীয় দৈনিকের ফটোসাংবাদিক। পরাগ ভায়ের আরো একটি উল্লেখযোগ্য গুন হলো তিনি “ওরিগাম “ চর্চাও করেন। আর এটি না বললেই নয় যে রাজশাহীর সর্ব বৃহৎ ব্যক্তিগত পাঠাগারটি নিঃসন্দেহে পরাগ ভায়ের। এই সাইটে আমার পছন্দের মানুষটিকে উপস্থাপন ও পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ.....
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ জাকির ভাই। আপনি না জানালে এই বিনয়ী ও নিরহংকার মহৎ মানুষটিকে চেনার ও জানার সুযোগ থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত হতাম।
Delete'ওরিগাম' মানে কি 'ওরিগ্যামি', যা কিনা কাগজ ভাঁজ করে তৈরি করা ভাস্কর্য?
পরাগদাদাকে, ফোটোগ্রাফিক সোসাইটির জন্য অনেক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন। এই ধরনের সোসাইটির মূল্য অপিরিসীম।
অনুবাদগুলো যারা করেছিলেন, তাদের নিজেদের গল্পগুলিও শোনার মত। আর তাছাড়া তাদের নিয়ে কৌতুহলও কম নয়। আমাদের ছোটবেলাতে বাংলায় এমন আলোঝলমল জগত যারা তৈরি করতেন, জানতে ইচ্ছা করতো তারা কেমন লোক। তাদের মধ্যে শ্রী দ্বিজেন শর্মা ঢাকাতে এখনো প্রচুর লেখালিখি করেন। তিনি তার সোভিয়েত দিনগুলির কথা, প্রগতি প্রকাশনীতে তার চাকুরীজীবনের কথা প্রচুর লিখেছেন। সম্ভবত সেই সময়কালীন অভিজ্ঞতা নিয়ে তার একটি বইও আছে প্রথমা প্রকাশনী থেকে। বেশ কিছুদিন আগে প্রথম আলোতে লিখেছিলেন "ননীদার কথা", অনুবাদক শ্রী ননী ভৌমিককে নিয়ে। আমার পক্ষে সম্ভব হলে এই লেখাগুলিও যোগাড় করে এখানে শেয়ার করবার ব্যবস্থা করতাম, কিন্তু পারছিনা।
ReplyDeleteআমার প্রানভরা কৃতজ্ঞতা জানাই এই সাইটের আয়োজকদের। বালক-কিশোরবেলাতে ভালো বাংলা বই পড়ার সু্যোগ করে দিয়েছিলো প্রগতি। সীমিত সাধ্যের মধ্যে বই পড়ার সুযোগ ছিলো কম, বৈচিত্র্য আরো কম। তাই সামান্য কিছু টাকা জমলেই মালিবাগ থেকে হেটে চলে যেতাম পল্টন, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশের বইয়ের দোকানে। এই সাইট সেই সরল আর রঙ্গীন সময়ের কথা মনে করিয়ে দিলো।
আমিনুল হক সাহেব, আমি প্রথমা প্রকাশনীতে শ্রী দ্বিজেন শর্মার লেখা কোন বই খুঁজে পেলাম না । দয়া করে বইটির নামটি লিখলে খুব ভালো হয় ।
ReplyDeleteThis comment has been removed by the author.
DeleteProbably "Shomajtontre Bosobash"
Deletehttp://www.boi-mela.com/BookDet.asp?BookID=16399
পরাগ ভাই, বছর দশেক আগে যখন আপনার লাইব্রেরী পথম দেথি তখন আপনার বইএর ভাণ্ডার দেখে আমি ত থ! তবে অনেক দিন পরে ঘরে বসেই আপনার লাইব্রেরির পাশাপাশি অন্যান্য অমূল্য বইগুলো পড়ার সুযোগ করে দেবার জন্য ধন্যবাদ।
ReplyDeleteআমার ছেলেবেলাটা সমসাময়িক অনেকের থেকেই একটু অন্যরকম ছিল। আমি পড়তাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার উদয়ন বিদ্যালয়ে। আমি ঐ স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম ১৯৮৫ সালে। বাবা মা দুজনেই ছিলেন চাকুরীজিবী; মা চাকরী করতেন একটা স্কুলে। প্রথমদিকে মায়ের সাথেই যাতায়াত করতাম। কিন্তু সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে বাসায় চলে গিয়ে আমার সময়টা কাটতো একাকীত্বে। তখন আম্মা একদিন আমাকে স্কুল ছুটির পর নিয়ে গেলেন ঢাকা পাবলিক লাইব্রেরীতে, পরিচয় করিয়ে দিলেন নতুন এক জগতের সাথে। এমনিতে আমাদের বাসাটা ছিল বইয়ের একটা রাজ্য কিন্তু আমার পড়ার অভ্যাস তখনো গড়ে উঠেনি।
ReplyDeleteপাবলিক লাইব্রেরীর ছোটদের বিভাগে গিয়ে আমিতো মুগ্ধ, কত রঙ বেরঙয়ের বই, তার মধ্যে কতশত ছবি আর মজার মজার গল্প! আমার দৈনিক জীবনযাত্রাই পালটে গেল। তখন আমি স্কুল ছিটুর পর সোজা হাঁটতে হাঁটতে চলে আসতাম পাবলিক লাইব্রেরীতে, কাটাতাম দুপুর পর্যন্ত; আম্মা তাঁর স্কুল ছুটি হলে আমাকে নিতে আসতেন পাবলিক লাইব্রেরীতে।
রুশ এবং চীনা শিশু সাহিত্যের সাথে আমার পরিচয়টা ঠিক ঐ সময়টাতে। বছর দু এক এর মধ্যেই ছবির বই এর পাশাপাশি পড়ে ফেললাম ভেরা চাপলিনার “আমাদের চিড়িয়াখানা”, আন্তন চেখভের “কাশতানকা" শুরু করে দিলাম আর্কাদি গাইদারের “ইশকুল”, আলেক্সেই লিওনভ এর “মহাকাশে মহামিলন”। আরো পড়েছিলাম “কাগজের নৌকো” সহ নাম মনে নেই এমন আরো বেশ কটি বই।
এই বইগুলো যখন আমি শুরু করি তখন আসলেই আমার বয়স হয়নি ছবির বইয়ের বাইরে কিছু পড়ার। কিন্তু পড়ার প্রতি আমার অপরিসীম আগ্রহ দেখে পাবলিক লাইব্রেরীর ছোটদের বিভাগের তত্বাবধায়কেরা আমাকে এসব বই খুঁজে দিতেন। এর পাশাপাশি বাসায় আসতো “উদয়ন” নামের সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি পত্রিকা। তাতে থাকতো অনেক যন্ত্রপাতি আর উন্নয়ন কর্মকান্ডের ছবি, দেখতে খুব ভাল লাগতো।
আরেকটু বড় হলে বাসার আলমারীতে খুঁজে পেলাম প্রগতি, রাদুগা আর রামধনুর অনেকগুলো বই। গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম ম্যাক্সিম গোর্কি, নিকোলাই অস্ত্রোভস্কি, আলেক্সান্দর বেলায়েভ, আলেক্সান্দ্র পুশকিন এবং আরো অনেকের রচনা।
আমার পাঠ্যাভ্যাসের পিছনে সোভিয়েত সাহিত্যের অবদান অপরিসীম। আমি আজো নিয়মিত বই পড়ি এবং সংগ্রহ করি কিন্তু মনস্তাপের বিষয় হচ্ছে ছোটবেলার সেই রুশ সাহিত্যের সংগ্রহের অধিকাংশই আজ কালের গর্ভে অথবা তথাকথিক শুভাকাংখীদের তৎপরতায় বিলীন হয়ে গেছে।
আমি আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে এই ওয়েবসাইটের পেছনের মানুষগুলোকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনাদের কল্যাণেই আমি আবার বিচরন করতে পারবো হারানো সেই দিনগুলোতে। আর অশেষ ধন্যবাদ রইল সেইসব অনুবাদকদের প্রতি, যারা নির্জন বিদেশ বিভুঁইয়ে থেকে শত পরিশ্রম করে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন এই অমর সাহিত্যমালা।
দুঃখিত "কাগজের নৌকো" নয়, বইটির নাম হবে "সাগরতীরে". স্মৃতির প্রতারণা :-) :-) :-)
ReplyDelete